'সোঁদামাটি' সাহিত্য পত্রিকা ও 'ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ' ফেসবুক গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে এই ওয়েবসাইট।

কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি



কাশিমবাজার ব্ৰাহ্মণ-রাজবংশ অতীব প্ৰাচীন। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতার নাম অযোধ্যারাম রায়; ইনি হটু রায় নামে বিখ্যাত। মহারাজা আদিশূর ৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে  যে পাঁচ জন ব্ৰাহ্মণকে কান্যকুব্জ থেকে বঙ্গে বেদ পাঠের জন্য এনেছিলেন, দক্ষ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অযোধ্যারাম সেই দক্ষের অধস্তন বাইশতম বংশধর। কৃষ্ণানন্দ ও জয়গোপাল রায় যথাক্রমে তার উদ্ধতন ষষ্ঠ ও চতুর্থ পুরুষ। রাজা আদিসুরের রাজধানী ছিল ব্রহ্মপুর, যা বর্তমানে বহরমপুর নামে পরিচিত। পরবর্তিতে এই ব্রাহ্মণরা মুখ্যোপাধ্যায়, বন্দোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় ও চট্টোপাধ্যায় হয়েছিল। কাশিমবাজারের এই ব্রাহ্মণ বংশের কৌলিক পদবি ছিল চট্টোপাধ্যায়, কিন্তু অযোধ্যারাম রায় অসামাণ্য মেধার জন্য নবাব নাজিম-এর কাছ থেকে "রায়" উপাধি লাভ করেন।

      অযোধ্যারাম রায়ের পুত্ৰ দীনবন্ধু রায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাশিমবাজার রেশম-কুঠীর দেওয়ান ছিলেন। তিনি নবাব সরকারের কাছ থেকে খেলাত (রাজার দেওয়া সম্মানসূচক পোষাক) ও রৌপ্যমণ্ডিত ছড়ি ব্যবহারের অধিকার পেয়েছিলেন। সেইকালে রৌপ্যমণ্ডিত ছড়ি ব্যবহার করা বিশিষ্ট সম্মান ও সন্ত্রমের পরিচায়ক ছিল। দীনবন্ধু রায়ের পুত্র জগবন্ধু রায় ও ব্ৰজমোহন রায় কিছুকাল কাশিমবাজার রেশম-কুঠীর দেওয়ানী করেছিলেন। এই সময় থেকেই বংশের খ্যাতি-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময়ে তারা পদ্মার তীরবর্তী পিরোজপুর গ্ৰাম থেকে উঠে এসে কাশিমবাজারে স্থায়িভাবে বসবাস করতে থাকেন। এখনও রাজ-ষ্টেট থেকে পিরোজপুরের গৃহদেবতা মদনগোপালের সেবার ব্যয় প্রদত্ত হয়ে থাকে। জগবন্ধু রায় উদ্যমশীল পুরুষ ছিলেন। হিজলী-কঁথিতে নতুন নিমক মহাল স্থাপিত হলে ইনি তার দেওয়ান হন। পরে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী তাঁকে মেদিনীপুর কলেক্টরীর দেওয়ান নিযুক্ত করে। তিনি নিলামে পূর্ববঙ্গের রংপুর ও সরাইল পরগনায় বিশাল জমিদারি কিনেন। 
    জগবন্ধুর পরবর্তী উত্তরসূরিরা হলেন নৃসিংহপ্রসাদ (১৭৬৭-১৮২৭) এবং তাঁর পরে রাজকৃষ্ণ (১৮০৭-১৮৬৭), অন্নপ্রসাদ (১৮৫০-১৮৭৮) হয়ে আশুতোষনাথ (১৮৭৪-১৯০৬)। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে রাজা আশুতোষনাথের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকারী কমলারজ্ঞন নাবালক হওয়ায় কাশিমবাজার রাজবাড়ির যাবতীয় ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার প্রথানুযায়ী ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস’-এর হাতে। কমলারঞ্জন সাবালক হলে ১৯২৫ সালে কাশিমবাজারের জমিদারির দায়িত্ব পেলেন এবং অবিলম্বে নিয়োগ করলেন এক পেশাদারী পরিচালন সমিতি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও  রাজবাড়ির আসবারপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীর চেহারা সংস্কার করে অক্ষুন্ন রেখেছেন উত্তরসূরিরা। রাজা কমলারঞ্জনের একমাত্র পুত্র প্রশান্তকুমার (জন্ম -১৯৪১) এবং পৌত্র পল্লব (জন্ম- ১৯৬৪) ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ‘দ্য সুগার আন্ড স্পাইস’ এর কর্ণধার হিসেবে ইতিমধ্যেই সুপরিচিত রাজা কমলারঞ্জনের পুত্রবধূ সুপ্রিয়া রায়। সমবেত পারিবারিক উদ্যোগে তাঁরাই আজ কাশিমবাজার রাজবাড়ির সুদৃশ্য প্রাসাদটিকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে এনেছেন।
    কাশিমবাজার রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৫০০মিটার পূর্বদিকে কাশিমবাজার ব্ৰাহ্মণ রাজবাড়ি, যা রাজছোট রাজবাড়ি নামে পরিচিত। আলিবর্দি খাঁয়ের রাজত্ব চলাকালীন ১৭৪০ সালে দীনবন্ধু রায় এই সুন্দর প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। এখানে একটি ছোট মিউজিয়াম এবং দুর্গা মন্দির ও লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির আছে।




শেয়ার করুন

No comments:

Post a Comment