'সোঁদামাটি' সাহিত্য পত্রিকা ও 'ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ' ফেসবুক গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে এই ওয়েবসাইট।

‪কিরীটেশ্বরী মন্দির


মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীনতম পীঠস্থান কিরীটেশ্বরী। বহরমপুর থেকে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ধরে পলসন্ডার মোড় থেকে লালবাগের সড়ক ধরে কিরীটেশ্বরী যেমন যাওয়া যায়, তেমনি লালবাগ কোর্ট রেল ষ্টেশনে নেমেও যাওয়া যায়। এছাড়া লালবাগ সদর ফেরিঘাট থেকে নৌকা পার হয়ে পশ্চিমে প্রায় ৭কিমি গেলে কিরীটেশ্বরী।

পৌরাণিক কাহিনী মতে, দক্ষযজ্ঞের পর সতী দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব সতীর দেহ নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। তখন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১টি খন্ডে খন্ডিত করেন। প্রতিটি খন্ড যেখানেই পড়ে সেখানেই একটি পীঠস্থান হয়। এই কিরীটেশ্বরীতে পড়েছিল সতীর মাথার কিরীট। এই মহাপীঠের দেবীর নাম বিমলা এবং ভৈরবের নাম সম্বর্ত্ত।
প্রাচীনকাল থেকেই কিরীটেশ্বরী তান্ত্রিক মহাপীঠ হিসাবে রাঢ় অঞ্চলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। গুপ্ত সম্রাটরা শক্তি-উপাসক ছিলেন। ওই রাঢ় এলাকা তাদের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সময় থেকে অর্থাৎ প্রায় দু'হাজার বছর থেকে কিরীটেশ্বরী মহাপীঠ হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পরবর্তীকালে হিন্দু রাজাদের রাজত্বকালেও রাঢ় অঞ্চলে শক্তি পূজা অব্যাহত ছিল। কিরীটেশ্বরী মহাপীঠের গৌরব তখনও কমেনি। মুসলমান রাজত্বকালেও কিরীটেশ্বরী একটি প্রধান তীর্থস্থান হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সময় মঙ্গল বৈষ্ণব ছিলেন কিরীটেশ্বরীর সেবক। মঙ্গল বৈষ্ণব পরে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং গদাধরের শিষ্য হন। মুর্শিদাবাদে তিন সুবার রাজধানী হবার পর থেকে কিরীটেশ্বরীর প্রসিদ্ধি আরও বেড়ে গিয়েছিল। ডাহাপাড়ার বঙ্গাধিকারীদের উপর কিরীটেশ্বরী মহাপীঠের পূজার ভার দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবতঃ কিরীটেশ্বরী তাদের জায়গীর মধ্যে পড়েছিল। এই সময় মহাপীঠের বহু উন্নতি হয়। সম্ভবতঃ সাহসুজার সুবাদারীর সময় কানুনগো ভগবান রায় এই অঞ্চল জায়গীর হিসেবে পেয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে ঢাকা থেকে মুর্শিদকুলী খাঁ যখন মুখসুদাবাদে রাজস্ব রাজধানী সরিয়ে এনেছিলেন তখন কানুনগো দর্পনারায়ণ ডাহাপাড়ার জায়গীর এসে তাঁদের বাসভবন ও কানুনগোই দপ্তর করেছিলেন। ভগবান রায়ের পৌত্র দর্পনারায়ণ মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব নেন। দেখেন মন্দিরের অবস্থা ভালো নাই। দেবীর গুপ্ত মন্দির ভেঙে পড়েছিল। তিনি মূল মন্দির সংস্করণ করেন এবং পাশে কালী সাগর নামে পুষ্করিণীটিও খনন করেছিলেন। এছাড়া কয়েকটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন। পৌষ মাসের শনি-মঙ্গল বারে এখানে যে মেলা হয় দর্পনারায়ণ তার প্রবর্তক। তাঁর ছেলে শিবনারায়ণ কিরীটেশ্বরী যাবার রাস্তা ও একটি পাকা সেতু নির্মাণ করিয়েছিলেন। নবাবী আমলে রাজা, মহারাজা ও জমিদাররা কিরীটেশ্বরীতে বহু মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। নাটোরের সাধক রাজা রামকৃষ্ণ কিরীটিশ্বরী মন্দির সংস্করণ করেন। এখানে তিনি সাধনা করতে আসতেন। নৌকায় করে যাতায়াতের জন্য তিনি বড়নগর থেকে কিরীটেশ্বরী পর্যন্ত একটি খাল খনন করেন।
কীরিটেশ্বরীর ভৈরব মূর্তিটি বর্তমানে মুর্শিদাবাদ জেলা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ভাঙা মন্দিরে পড়ে থাকার সময় মূর্তি-চোরদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নেহালিয়ার রায় সুরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ প্রস্তর মূর্তিটি নিয়ে আনে। তবে কষ্টিপাথরের এই মূর্তিটি শিবের নয়। এটি একটি ধ্যানী বুদ্ধ মূর্তি। পদ্মাসনে বসা মূর্তিটির ডান হাত হাঁটুর উপরে এবং বাঁ হাত কোলে। মূর্তির গলায় যজ্ঞোপবীত। উচ্চতা প্রায় আড়াই হাত। সম্ভবতঃ পাল রাজত্বকালে এই মূর্তিটি কীরিটেশ্বরীতে স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভক্তির বিশ্বাসে বুদ্ধদেব ভৈরব হয়েছেন।

লালগোলার রাজা রাও যোগেন্দ্র নারায়ণ রায় মূল মন্দির শেষবারের মতো সংস্কার করে গেছেন। তারপর আর সংস্কার হয়নি। গুপ্তমন্দির বর্তমানে ভেঙে পড়ছে। বহু শিব মন্দির ভূমিসাৎ হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় কিরীশ্বরীর দেখভাল হয়।


শেয়ার করুন

No comments:

Post a Comment